আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী
আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী
আজ বৃহস্পতিবার ১২ ভাদ্র। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এদিনে শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বিদ্রোহী কবি।
কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। এখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ বেতার,বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এ উপলক্ষে পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকালে শোভাযাত্রা সহকারে কবির সমাধি প্রাঙ্গণে গমন, পুষ্পার্ঘ অর্পণ এবং ফাতেহা পাঠ ও পরে কবির মাজার প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা। সকাল সাড়ে দশটায় প্রশাসনিক ভবনস্থ অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাস রুমে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে আলোচনা সভা ।বাংলা একাডেমি কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচির আয়োজন করেছে। সকালে একাডেমির পক্ষ থেকে জাতীয় কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে।
বেলা ১১ টায় একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে স্বাগত বক্তৃতা করবেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। একক বক্তব্য দিবেন এ এফ এম হায়াতুল্লাহ। এতে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে নজরুলের কবিতা থেকে আবৃত্তি এবং নজরুলগীতি পরিবেশনা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন।
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।
প্রেম, দ্রোহ, সাম্যবাদ ও জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।
নজরুলের কবিতা, গান ও সাহিত্য কর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করে। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক। তাঁর লেখনি জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে।
১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারী আদেশ জারী করা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করেন এবং ধানমন্ডিতে কবিকে একটি বাড়ি দেন।
এরপর যথেষ্ট চিকিৎসা সত্ত্বেও নজরুলের স্বাস্থ্যের বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কবির সবচেয়ে ছোট ছেলে এবং বিখ্যাত গিটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধ মৃত্যুবরণ করে। ১৯৭৬ সালে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নজরুল তার একটি গানে লিখেছেন, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই / যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”:- কবির এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তার সমাধি রচিত হয়।
তার জানাজার নামাজে ১০ হাজারেরও অধিক মানুষ অংশ নেয়। জানাজা নামায আদায়ের পরে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকামণ্ডিত নজরুলের মরদেহ বহন করে সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গনে নিয়ে যান। বাংলাদেশে তার মৃত্যু উপলক্ষে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয় এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের
জন্মঃ ২৫ মে, ১৮৯৯
বাংলাঃ ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬
স্থানঃ চুরুলিয়া, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ রাজ (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ)
মৃত্যুঃ ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬
বাংলাঃ ১২ই ভাদ্র ১৩৮৩
স্থানঃ ঢাকা, বাংলাদেশ
পিতাঃ কাজী ফকির আহমদ।
মাতাঃ জাহেদা খাতুন
স্ত্রীঃ
১) নার্গিস আসার খানম (সৈয়দা খাতুন): বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী। কবি তার ছায়ানট, পূবের হাওয়া, চক্রবাক কাব্য গ্রন্থের অনেক কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে রচনা করেন। ছায়ানটের মোট ৫০ টি কবিতার মধ্যে বেদনা অভিমান, অবেলায়, হার মানা হার, অনাদৃতা, হারামনি, মানস বধু, বিদায় বেলায়, পাপড়ি খেলা ও বিধূর পথিকসহ মোট নয়টি কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে লেখেন।
২) প্রমিলা দেবীঃ কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী।
৩) বেগম ফজিলাতুন্নেসাঃ কাজী নজরুল ইসলামের তৃতীয় স্ত্রী।
তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মধ্যবয়সে তিনি পিক্স ডিজিসে আক্রান্ত হন।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে তাকে `জাতীয় কবি` হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে D.Litt. ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে তাকে `একুশে পদক` প্রদান করা হয়।
নজরুল রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে অগ্নিবীণা (কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ), সঞ্চিতা, মরুভাস্কর, চিত্তনামা, ছায়ানট, বিষের বাশী, সন্ধ্যা, দোলন চাপা, জিন্জির, চক্রবাক, প্রলয়শিখা, ফণিমনসা, সর্বহারা, সিন্ধু হিন্দোল, ভাঙ্গার গান, ঝিঙে ফুল, সাম্যবাদী।
লেখকের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ হচ্ছে ব্যথার দান (প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ), রিক্তের বেদন, শিউলিমালা।
তার রচিত উপন্যাস হচ্ছে বাধনহারা (প্রথম উপন্যাস), মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা।
তার রচিত নাট্যগ্রন্থ হচ্ছে ঝিলিমিলি (প্রথম নাট্যগ্রন্থ), পুতুলের বিয়ে, আলেয়া, মধুমালা।
লেখকের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ হচ্ছে যুগবাণী (প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ), রাজবন্দীর জবানবন্দী, দুর্দিনের যাত্রী। কবির প্রথম কবিতা মুক্তি ।
এক নজরে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মঃ
কবিতা
অগ্নিবীণা (কবিতা) ১৯২২
সঞ্চিতা (কবিতা সংকলন) ১৯২৫
ফনীমনসা (কবিতা) ১৯২৭
চক্রবাক (কবিতা) ১৯২৯
সাতভাই চম্পা (কবিতা) ১৯৩৩
নির্ঝর (কবিতা) ১৯৩৯
নতুন চাঁদ (কবিতা) ১৯৩৯
মরুভাস্কর (কবিতা) ১৯৫১
সঞ্চয়ন (কবিতা সংকলন) ১৯৫৫
নজরুল ইসলাম: ইসলামী কবিতা (কবিতা সংকলন) ১৯৮২
কবিতা ও সংগীত
দোলন-চাঁপা (কবিতা এবং গান) ১৯২৩
বিষের বাঁশি (কবিতা এবং গান) ১৯২৪
ভাঙ্গার গান (কবিতা এবং গান) ১৯২৪
ছায়ানট (কবিতা এবং গান) ১৯২৫
চিত্তনামা (কবিতা এবং গান) ১৯২৫
সাম্যবাদী (কবিতা এবং গান) ১৯২৫
পুবের হাওয়া (কবিতা এবং গান) ১৯২৬
সর্বহারা (কবিতা এবং গান) ১৯২৬
সিন্ধু হিন্দোল (কবিতা এবং গান) ১৯২৭
জিঞ্জীর (কবিতা এবং গান) ১৯২৮
প্রলয় শিখা (কবিতা এবং গান) ১৯৩০
শেষ সওগাত (কবিতা এবং গান) ১৯৫৮
সংগীত
বুলবুল (গান) ১৯২৮
সন্ধ্যা (গান) ১৯২৯
চোখের চাতক (গান) ১৯২৯
নজরুল গীতিকা (গান সংগ্রহ) ১৯৩০
নজরুল স্বরলিপি (স্বরলিপি) ১৯৩১
চন্দ্রবিন্দু (গান) ১৯৩১
সুরসাকী (গান) ১৯৩২
বনগীতি (গান) ১৯৩১
জুলফিকার (গান) ১৯৩১
গুল বাগিচা (গান) ১৯৩৩
গীতি শতদল (গান) ১৯৩৪
সুর মুকুর (স্বরলিপি) ১৯৩৪
গানের মালা (গান) ১৯৩৪
স্বরলিপি (স্বরলিপি) ১৯৪৯
বুলবুল দ্বিতীয় ভাগ (গান) ১৯৫২
রাঙ্গা জবা (শ্যামা সংগীত) ১৯৬৬
ছোট গল্প
ব্যাথার দান (ছোট গল্প) ১৯২২
রিক্তের বেদন (ছোট গল্প) ১৯২৫
শিউলি মালা (গল্প) ১৯৩১
উপন্যাস
বাঁধন হারা (উপন্যাস) ১৯২৭
মৃত্যুক্ষুধা (উপন্যাস) ১৯৩০
কুহেলিকা (উপন্যাস) ১৯৩১
নাটক
ঝিলিমিলি (নাটক) ১৯৩০
আলেয়া (গীতিনাট্য) ১৯৩১
পুতুলের বিয়ে (কিশোর নাটক) ১৯৩৩
মধুমালা (গীতিনাট্য) ১৯৬০
ঝড় (কিশোর কাব্য-নাটক) ১৯৬০
পিলে পটকা পুতুলের বিয়ে (কিশোর কাব্য-নাটক) ১৯৬৪
প্রবন্ধ এবং নিবন্ধ
যুগবানী (প্রবন্ধ) ১৯২৬
ঝিঙ্গে ফুল (প্রবন্ধ) ১৯২৬
দুর্দিনের যাত্রী (প্রবন্ধ) ১৯২৬
রুদ্র মঙ্গল (প্রবন্ধ) ১৯২৭
ধুমকেতু (প্রবন্ধ) ১৯৬১
অনুবাদ এবং বিবিধ[সম্পাদনা]
রাজবন্দীর জবানবন্দী (গান) ১৯২৩
দিওয়ানে হাফিজ (অনুবাদ) ১৯৩০
কাব্যে আমপারা (অনুবাদ) ১৯৩৩
মক্তব সাহিত্য (মক্তবের পাঠ্যবই) ১৯৩৫
রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম (অনুবাদ) ১৯৫৮
নজরুল রচনাবলী (ভলিউম ১-৪,বাংলা একাডেমী)১৯৯৩
সঙ্গীত গ্রন্থাবলী
বুলবুল (১ম খন্ড-১৯২৮, ২য় খন্ড-১৯৫২)
চোখের চাতক (১৯২৯)
চন্দ্রবিন্দু (১৯৪৬)
নজরুল গীতিকা (১৯৩০)
নজরুল স্বরলিপি (১৯৩১)
সুরসাকী (১৯৩১)
জুলফিকার (১৯৩২)
বনগীতি (১৯৩২)
গুলবাগিচা (১৯৩৩)
গীতিশতদল (১৯৩৪)
সুরলিপি (১৯৩৪)
সুর-মুকুর (১৯৩৪)
গানের মালা (১৯৩৪)।
ছবিঃ সংগ্রহ , তথ্যঃ উইকিপিডিয়া

