জমজম কূপ

জমজম কূপ – বরকতময় পানির স্রোতধারা

জমজম, পবিত্র কাবার অভ্যন্তরে অবস্থিত বরকতময় পানির কূপ । প্রায় চার হাজার বছরপূর্বে সৃষ্টি হয়েছিল  পবিত্র জমজমের  স্রোতধারা ।বিশ্বের এক অনন্য নিদর্শন। আরবি ভাষায় জমজম শব্দের অর্থ ‘ অঢেল পানি’ । তিব্রানি ভাষায় জমজমের মানে ‘ থাম ‘ ।  রাকদাতুল জিব্রিল ও বির –ই- ইসমাইল সহ প্রায় বারোটি নামে জমজমকে অভিহিত করা হয় ।  কূপ সৃষ্টির পর হযরত হাজেরা (আঃ) চারপাশে  পাথর দিয়েও পানি আটকাতে না পেরে , পানিকে  উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন জমজম, অর্থাৎ থাম থাম । সেই থেকে এই পানির প্রবাহ জমজম কূপ নামেই পরিচিত

মক্কায় পবিত্র কাবা থেকে ৬৬ ফুট দূরে জমজম কূপের  অবস্থান । ঐতিহাসিক মতে , এ কূপে দুটি জলাধার ছিল । একটি খাওয়ার জন্য , অন্যটি অজুকরার জন্য । প্রথম পর্যায়ে কূপে পাথরের বেষ্টনী ছিল । ৭৭১ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর কূপের চারপাশে মার্বেল পাথরের গম্বুজ নির্মাণ করেন । ৭৭৫খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল মাহদি জমজম কূপের পুনঃসংস্কার করেন । তিনি সেগুন কাঠেরগম্বুজ নির্মাণ করেন । তখন দুটো গম্বুজের মধ্যে ছোটটি ছিল কূপের জন্য এবং বড়টি ছিল দর্শনার্থীদের জন্য । ৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে মার্বেল পাথরের গম্বুজ নির্মাণ করেন খলিফাআল মুতাসিম । ১৯১৫ সনে সুলতান আব্দুল হামিদ কূপের সর্বাধিক আধুনিকায়ন করেন । এসময় হতে তাওয়াফের স্থান প্রসস্থ করা হয় ।

জমজমের  উৎপত্তি সম্পর্কে ইসলামের ইতিহাসের বর্ণনায় পাওয়া যায় , নবী ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা (আঃ) ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আঃ) কে আল্লাহর নির্দেশে মক্কার মরুভূমিতে রেখে আসেন । সাথে থাকা খাদ্য ও পানীয় শেষ হয়ে গেলে হাজেরা (আঃ) পানির সন্ধানে পার্শ্ববর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাতবার ছোটাছুটি করেন ।সেসময় ক্রন্দনরত শিশুপুত্র ইসমাইল (আঃ) এর পায়ের আঘাতে মাটি ফেটে সৃষ্টি হয় পানির ফোয়ারা ।ফিরে এসে হাজেরা (আঃ) এ দৃশ্য দেখে পাথর দিয়ে পানির প্রবাহকে আবদ্ধ করেন,যা পরবর্তীতে কুয়ায় রূপ নেয়

জমজম কূপের গভীরতা ৯৮ ফুট বা ৩০ মিটার , যার ব্যাস ৩.৭ফুট ও ৮.৯ ফুট । প্রথম দিকে দড়ি বা বালতির সাহায্যে পানি উত্তোলন করা হতো ।বর্তমানে বৈদ্যুতিক পাম্পের সাহায্যে পানি তুলে মসজিদের সর্বত্র সরবরাহ করা হয় ।কূপের নিচের আংশে আছে জমাট শিলা এবং উপরের এক মিটার কংক্রিট দ্বারা তৈরি । সৌদি ভূতাত্ত্বিক জরিপ বোর্ড জমজম কূপের উপর স্থাপন করেছে একটি গবেষণাকেন্দ্র । তারা কূপের পানির তাপমাত্রা , স্তর ও অন্যান্য উপাদান পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে বিশ্বব্যাপী তথ্য পরিবেশন করে থাকে ।  কূপের তলে পানির স্তর ১০.৬ ফুট । গবেষণায় দেখাগেছে , পাম্পের সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে ৮০০০ লিটার পানি উঠিয়ে ৪৩.৯ ফুট পূর্ণ করাহলেও  পাম্প থামানোর মাত্র ১১ মিনিটের মধ্যে তা আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে ।

গবেষণায় দেখা গেছে , ওয়াদি ইব্রাহিমে বৃষ্টিপাত শোষণের মাধ্যমে কূপে পানি এসে থাকে । শুষ্ক মরু অঞ্চলে সমগ্র আরব শুকিয়ে গেলেও  জমজম সৃষ্টির  পর থেকে আজ অবধি  এর উপর কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় নি । কিং সৌদি বিশ্ববিদ্যালয় কূপের পানি পরীক্ষা করে এর পুষ্টিগুণ ও উপাদান নির্ণয় করেছে ।জমজমের পানির কোন গন্ধ বা রং নেই ,তবে এর স্বাদ ভিন্ন ।জমজমের পানিতে ফ্লুরাইড  বেশি থাকায় এতে  জীবাণু ,  শৈবাল বা ছত্রাকের কোন অস্তিত্ব নেই । হজ্ব মৌসুমেপানির ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার পরও পানির স্তর কখনও নিচে নামে নি। পানির গুনাগুণ , উপাদান সবসময় একই পরিমাণে থাকে । এতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সল্ট এরপরিমাণ সাধারণ পানির চেয়ে বেশি থাকায় , এ পানি শুধু  পিপাসা মেটায় না ক্ষুধাও  নিবারণ করে । এই পানি পানে ক্লান্তি দূর হয় । কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে জমজমের পানিপান করা মুস্তাহাব।

জমজম

মহানবী (সাঃ) বলেছেন , ‘’ জমজমের পানি যে যেই নিয়তে পান করবে , তার সেই নিয়ত পূর্ণ হবে । যদি তুমি এই পানি রোগমুক্তির জন্য পান কর ,তাহলে আল্লাহ্‌ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন । যদি তুমি পিপাসা মেটানোর জন্য পান কর ,তাহলে আল্লাহ্‌ তোমার পিপাসা দূর করবেন । যদি তুমি ক্ষুধা দূর করার উদ্দেশ্যে তা পান কর , তাহলে আল্লাহ্‌ তোমার ক্ষুধা দূর করে তৃপ্তি দান করবেন । এটি জিবরাইল (আঃ)এর পায়ের গোড়ালির আঘাতে হজরত ইসমাইল (আঃ) এর পানীয় হিসেবে সৃষ্টি হয়েছে ।‘’ ( ইবনেমজাহ ও আল- আজরাকি )

tor-e-tokka.com# h/@.

ছবিঃ সংগ্রহ

আরও খবর