জয়নুল আবেদিন

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন – চিত্রশিল্পের জাদুকর

জয়নুল আবেদিন  বিংশ শতকের বিখ্যাত বাঙালী চিত্রশিল্পী । চিত্রশিল্পের প্রসারে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে শিল্পাচার্য্য উপাধিতে ভূষিত করা হয় ।  তাঁর চিত্রকলায় ব্যবহৃত  জলরঙের বৈশিষ্ট হালকা ও অনুজ্জ্বল এবং তুলির টান অত্যন্ত প্রাচ্যধর্মী । প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অপরূপ বাস্তবধর্মী সমন্বয় ঘটেছে তাঁর শিল্পকর্মে ।

জয়নুল আবেদিন

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অসাধারণ প্রতিভাবান এশিল্পী ১৯১৪ সনের ২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহুকুমার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন । নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড় (জ্যেষ্ঠ পুত্র) । বাবা তমিজউদ্দিন আহমদ ছিলেন দারোগা (সাব- ইন্সপেক্টর) , মা জয়নাবুন্নেসা গৃহিণী । পড়াশোনায় হাতেখড়ি শুরু হয়েছিল পারিবারিক পরিমণ্ডলেই । ছেলেবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর

১৯৩৩ সনে কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন জয়নুল আবেদিন । সেখানে পাঁচ বছর ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় স্টাইলের উপর পড়াশোনা করেন । ১৯৩৮ সনে তিনি আর্ট স্কুল অনুষদে যোগদান করেন । ১৯৩৮ সনেই সর্ব ভারতীয় চিত্রকলা প্রদর্শনীতে তাঁর আঁকা জলরঙের ছবি স্বর্ণপদকে ভূষিত হয় । এ স্বীকৃতিই তাকে প্রথমবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে এবং নিজস্ব ধারা সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত করে ।

জয়নুল আবেদিন

প্রাচ্য ও ইউরোপীয় অঙ্কন রীতিতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না । এই সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে তিনি রিয়ালিজমের প্রতি আকৃষ্ট হন । ১৯৪৩ সনে দুর্ভিক্ষে তিনি ধারাবাহিকভাবে একাধিক স্কেচ করেন । রেখা চিত্রের বৈচিত্রময় উপস্থাপন দেখা গেছে এই স্কেচগুলোতে । সস্তা প্যাকিং পেপারে চাইনিজ ইঙ্ক ও তুলির আঁচরে ‘ দুর্ভিক্ষের রেখচিত্র’ নামে পরিচিত চিত্রকর্মগুলি তাঁর নিজস্ব স্বকীয়তাকে বিকশিত করে তাঁকে ভারত ব্যাপী খ্যাতি এনে দেয় । এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫১ সনে ‘ দ্যা রেবেল ক্রো ‘ এবং ১৯৬৯ ও ১৯৭১ এ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাজ করেছেন ।

জয়নুল আবেদিন

১৯৪৭ সনে উপমহাদেশে বিভক্তির পর জয়নুল আবেদিন কলকাতা আর্ট স্কুলের চাকুরী ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় বসবাস শুরু করেন । সে সময় ঢাকায় আর্ট ইন্সটিটিউট বা এ ধরণের কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না । তিনি ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী মিলে বাঙালী সরকারী কর্মকর্তাদের সহায়তায় ১৯৪৮ সনে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস ‘ ।

জয়নুল আবেদিন

১৯৫১ সনে তিনি লন্ডনের স্লেড স্কুল অব আর্টে দুবছরের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন । ১৯৫২ সনে দেশে ফিরে তিনি দেশীয় ঐতিহ্যের সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক কৌশলের সমন্বয়ে চিত্রকলায় নতুন বাঙালী ধারার প্রবর্তন করেন । এ ধারায় রঙের ব্যবহার ও পারসপেক্টিভের পরিবর্তে গ্রামীণ বিষয়বস্তুতে জ্যামিতিক আকার বা আধা বিমূর্ত আদলের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয় । ‘দুই মহিলা’ (১৯৫৩) , ‘পাইন্যার মা ‘(১৯৫৩) , মহিলা( জলরঙ , ১৯৫৩) , একাকী বনে, আয়না নিয়ে বধূ হলো এ ধারারই উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম

জয়নুল আবেদিন

তাঁর অসাধারণ শিল্প প্রতিভার জন্য তিনি দেশে ও বিদেশে বহু পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন । বাংলাদেশে চারুকলার যথার্থ উন্নয়নে স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন ‘’শিল্পাচার্য ‘’ সম্বোধন । ১৯৭৪ সনে তিনি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ।

জয়নুল আবেদিন

১৯৬৯ সনে গণঅভ্যুত্থানকে ভিত্তি করে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ্য স্ক্রল পেইন্টিং ‘নবান্ন ‘ এবং ১৯৭০ সনের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারানো মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আঁকা ৩০ ফুট দীর্ঘ্য ‘মনপুরা’ পেইন্টিং এ তাঁর কর্মবৈচিত্র লক্ষ্য করা যায় । ১৯৭৫ এ তিনি সোনারগাঁও এ একটি লোকশিল্প জাদুঘর এবং ময়মনসিংহে একটি গ্যালারী প্রতিষ্ঠা করেন । দুটি প্রতিষ্ঠানে তাঁর আঁকা কিছু চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে । দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় তিনি ছিলেন সবসময় সক্রিয় যাতে পাশ্চাত্য প্রভাবে দেশীয় রীতি বিলুপ্ত না হয় । কিন্তু ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে তাঁর বেশ কিছু কাজ আসমাপ্ত রয়ে যায় । ১৯৭৬ সনের ২৮ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ।

জয়নুল আবেদিন

tor-e-tokka.com# h/@.

ছবিঃ সংগ্রহ

আরও খবর