রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস

আজ বাইশে শ্রাবণ। কবিগুরুর ৭৯তম প্রয়াণ দিবস। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এ দিনে পৃথিবী থেকে চির প্রস্থান করেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি মহাপুরুষ। তবে বিশ্বকবির এ প্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতে করোনার কারণে এবার কোন অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিরবে-নিভৃতে কুঠিবাড়ী জুড়ে শ্রাবণের রিমঝিম বর্ষণে কাটছে বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবস। এদিকে করোনা সংকটে কোন প্রকার জনসমাগম না করার কারণে কুষ্টিয়া শিলাইদহ কুঠিবাড়ী বা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কোথাও কোন আয়োজন করা হয় নি।

কবিগুরুর ৭৯তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে করোনা সংকটের কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসে কোনো অনুষ্ঠান থাকছে না। টেলিভিশন, রেডিও, দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও কর্মের ওপর বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করছে, লেখা প্রকাশ করছে।

মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ মানুষের ওপর দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল ছিলেন। তাঁর মতে, মানুষই পারে অসুরের উন্মত্ততাকে ধ্বংস করে পৃথিবীতে সুরের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। তাই ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’

প্রতি বছর কবিগুরুর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতে প্রত্মতত্ব বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে থাকে আলোচনা সভা, রবীন্দ্র সংগীত, কবিতা আবৃতিসহ নানা আয়োজন। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। তবে ফেসবুক, ইউটিউবে কবিগুরুকে স্মরণ করা হবে। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণতি জানানো হবে বলে জানিয়েছেন রবীন্দ্র ভক্তরা।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৌঁছে দিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। বিশ্ব দরবারে চিনিয়েছেন বাংলা ভাষাকে। এনেছেন সাহিত্যের নোবেল। বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালি জাতির দিকনির্দেশক এক আলোকবর্তিকা। বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছুর সঙ্গেই একটু একটু করে মিশে আছে রবীন্দ্রনাথ! গত দেড় শতাব্দী ধরে বাঙালির মানসপটে তার দাপুটে অবস্থান। তাকে বাদ দিয়ে বাঙালির চিন্তার ভূগোল, ভাবের প্রকাশ, রস আস্বাদন— কিছুই সম্ভব না। বাঙালি সত্তায় রবীন্দ্রনাথ সদা জাগ্রত। বাঙালি জীবনে যত ভাব-বৈচিত্র্যের সমারোহ, তার পুরোটাই তিনি ধারণ করেছেন তার গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান, স্মৃতিকথা আর দর্শনে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১২৬৮ বঙ্গাব্দের পঁচিশে বৈশাখ। মা সারদাসুন্দরী দেবী, বাবা কলকাতার বিখ্যাত জমিদার ও ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৭৫ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতাকেও তিনি খুব একটা কাছে পাননি। ১৪তম সন্তান হিসেবে যখন রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়, ততদিনে দেবেন্দ্রনাথের গৃহের মায়া অনেকটা শিথিল হয়েছে। তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছে ভৃত্যদের অনুশাসনে।

শৈশবে তিনি কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নরম্যাল স্কুল, বেঙ্গল একাডেমি ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির কনিষ্ঠপুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখতে শুরু করেন ৮ বছর বয়সে। আটপৌরে বাঙালির মতো তার শুরুটা হয়েছিল কবিতা দিয়ে এবং একদিন সেই কবিতাই তাকে তুলে ধরে বিশ্ব দরবারে। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকবি।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশে ইংল্যান্ড যান ঠাকুর বাড়ির কনিষ্ঠ (রবীন্দ্রনাথের পর বুধেন্দ্রনাথের জন্ম। কিন্তু তিনি ছিলেন স্বল্পায়ু। সেই হিসেবে রবীন্দ্রনাথকেই কনিষ্ঠ পুত্র বলা হয়। সেখানে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

কিন্তু গৃহের টান তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বাংলার নদী, বাংলার জল, বাংলার পাখি, বাংলার ফল হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। তাই মাত্র দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে ১৮৮০ সালে কোনো ডিগ্রি না নিয়েই দেশে ফিরে আসেন। এর তিন বছরের মাথায় পারিবারিক রেওয়াজ মেনে ১৮৮৩ সালের ভবতারিণীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সদ্য কৌশোর পেরেনো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ হয়েছিল মৃণালিনী দেবী।

সন্ন্যাস জীবনের স্বপ্ন কখনো দেখেননি রবীন্দ্রনাথ। বরং সন্ন্যাস জীবনের ঘোরবিরোধী ছিলেন তিনি। পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়।’ সে কারণেই হয়তো সংসার সাধনার মধ্যেই চলতে থাকে তার সাহিত্যচর্চা। ১৮৯১ সাল থেকে পিতার আদেশে নদিয়া, পাবনা, রাজশাহী ও উড়িষ্যার জমিদারি তদারকি শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে তিনি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে। মৃত্যুর মাত্র এক মাস আগে ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসের শেষের দিকে শান্তিনিকেতন ছেড়ে কোলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে ফিরে যান। সেখানেই ২২ শ্রাবণ মহাপ্রয়াণ ঘটে তার।

কবির লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের জাতীয় সংগীতটিও কবির লেখা। জীবিতকালে তার প্রকাশিত মৌলিক কবিতাগ্রন্থ হচ্ছে ৫২টি, উপন্যাস ১৩, ছোটোগল্পের বই ৯৫টি, প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ ৩৬টি, নাটকের বই ৩৮টি। কবির মত্যুর পর ৩৬ খণ্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ প্রকাশ পায়। এ ছাড়া ১৯ খণ্ডের রয়েছে ‘রবীন্দ্র চিঠিপত্র’। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত কবির আঁকা চিত্রকর্মের সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৭৪টি চিত্রকর্ম শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে। কবির প্রথম চিত্র প্রদর্শনী দক্ষিণ ফ্রান্সের শিল্পীদের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে প্যারিসের পিগাল আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়।

ছবিঃ সংগ্রহ

আরও খবর