মধ্য আমেরিকার রহস্যময় পত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন -চিচেন ইতজা
মধ্য আমেরিকার রহস্যময় পত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন -চিচেন ইতজা
চিচেন ইতজা পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় ও দৃষ্টিনন্দন পত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ।প্রাক কলম্বিয়ান সময়ের মায়া সভ্যতার একটি বড় শহর ছিল এই চিচেন ইতজা। পত্নতাত্ত্বিক এ স্থানটি মেক্সিকোর ইউকাতান রাজ্যের তিনুম পৌরসভায় আবস্থিত । মায়া হলো মেসোঅ্যামেরিকান সভ্যতা । প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ শহরটি ষষ্ট থেকে নবম শতাব্দীর মাঝে মায়া লোল্যান্ডের উত্তরে গড়ে উঠেছিল । ১০৫০ সালের মধ্যে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে যুকাতানের আঞ্চলিক রাজধানীতে পরিণত হয় ।

‘চিচেন’ শব্দের অর্থ কুপের মুখ, আর ‘ইতজা’ অর্থ জাতি বা উপজাতি অর্থাৎ ওই স্থানে বসবাসরত উপজাতি । মেক্সিকান এই শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘ইতজা কুয়োর মুখ’ । দুটো প্রাকৃতিক কুয়োর মাঝেই ছিল চিচেন ইতজা । প্রকৃতপক্ষে এটি একটি পিরামিড । চিচেন ইতজার অবশ্য আরো একটি নাম আছে , তা হলো ‘আনসাইবানাল’। এ শব্দের অর্থ সপ্তপ্রভু বা সাত শাসক । ধাপে ধাপে নির্মিত হয়েছে বলে একে স্টেপ পিরামিডও বলে ।নবম ও দশম শতকের মাঝামাঝিতে তারা তৈরি করেছিল একশ ফুট উচ্চতার এ উপাসনালয় । চারদিকে ৯১ টি করে সিঁড়ির ধাপ , সব মিলিয়ে ৩৬৫ টি ধাপ ছিল এই উপাসনালয়ে । সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত তাই একে সূর্য দেবতার মন্দিরও বলা হয় ।
চিচেন ইতজা
‘ ইতজা ‘ মায়া সভ্যতার গুয়েতেমালার একটি জাতি । চিত্রাংকন, গণিত , স্থাপত্য সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখন ভাষার উদ্ভাবক এই ইতজা জাতি । অন্যান্য মায়া শহরের সাথে ইতজার লক্ষ্যনীয় পার্থক্য হচ্ছে , অন্যান্য শহর গড়ে উঠেছিল শুধু মায়া স্থাপত্যকৌশলে আর চিচেন ইতজার স্থাপত্যে মায়াসহ মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন সভ্যতার সংমিশ্রণ ঘটেছে । বিভিন্ন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর আসা –যাওয়া ছিল এখানে । চিচেন ইতজায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীতে ছিল ব্যাপক বৈচিত্র , যার ছাপ লক্ষ্য করা যায় তাদের স্থাপত্যে । তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ স্থাপত্যশৈলীতে ভূমিকা রেখেছে ।

মায়া সভ্যতার ভাষাগুলোর একটি হলো ইতজা ভাষা । মূলত ভাষা থেকেই এসেছে এ জাতির নাম । ভাবের আদান- প্রদানের জন্য তারা ৮০০ টিরও বেশী ছবি ব্যবহার করত । এসব ছবি থেকে তাদের সভ্যতা – সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় । গাছের বাকল থেকে তারা বই বানাত, সেগুলকে বলা হয় কোডেক্স । মাত্র চারটি কোডেক্স অক্ষতভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে । পশুর লোম থেকে তৈরি তুলির সাহায্যে তারা লিখত । বর্তমানে চিচেন ইতজার অবস্থান মেক্সিকোর যুকাতান রাজ্যের পূর্বাংশে । ইতজাগোষ্ঠীরা এখন স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে । তাদের আদি ভাষা বিলুপ্ত প্রায় ।

তাদের ধর্ম বিশ্বাস ছিল প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল । সভ্যতার একেক পর্যায়ে তাদের ধর্মীয় রীতি- নীতি ছিল একেক রকম । তাদের ধর্ম বিশ্বাস খানিকটা গোপনীয় ও রহস্যময় । তারা বিশ্বাস করতো সকল প্রাণ ও শক্তির উৎস ঈশ্বর । কেবল ঈশ্বরই পারেন জাগতিক সবকিছুর সাথে পরজাগতিক যোগাযোগ ঘটাতে । ঈশ্বর মিশে আছেন চন্দ্র, সূর্য আর বৃষ্টির সঙ্গে , মানুষের সকল প্রার্থনা তিনি শোনেন । তাদের ধারণা ছিল , ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের একমাত্র মাধ্যম নিজ দেহের রক্ত । তাই তাদের বিশেষ অনুষ্ঠানে ঈশ্বরের নামে রক্ত বিসর্জন দিত । গুরুত্ববাহী অনুষ্ঠানে রক্ত দিতেন স্বয়ং রাজা । সব আচার পলিত হত অত্যন্ত গোপনে, কেননা এর মধ্য দিয়ে তারা পেত ঈশ্বরের দর্শন । বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিকেও তারা পূজা করত । পৃথিবীর সকল মানুষের জন্ম ছোট ছোট শস্য দানা থেকে- মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে এই ছিল তাদের বিশ্বাস ।
তাদের দুই অমর দেবতার একজন হলো ইতজামনা ।ইতজামনা মহাপরাক্রমশীল আকাশচারী দেবতা । দেবতাকে খুশী করতে যাজকরা পিরামিডের উপর নরবলি দিত । উৎসর্গের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতো তাদের বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী । এছাড়া তাদের ছিল মৃত্যু দেবতা আহপুছ, উর্বরতার দেবতা চিয়াক, সূর্য দেবতা কিনিস আহাউ, জীবন- মৃত্যু নিয়ন্ত্রক দেবতা বি, নরকের দেবতা এল ইত্যাদি ।

প্রত্নতাত্বিকরা চিচেন ইতজায় বেশকিছু বল কোর্টের সন্ধান পেয়েছেন । এরমধ্যে গ্রেট বল কোর্ট সবচেয়ে বড় ও সুরক্ষিত । বল কোর্টের উত্তর অংশে রয়েছে টেম্পল অব দ্যা বিয়ারডেড ম্যান । এছাড়া এল ক্যাসিলো, টেম্পল অব দ্যা ওয়ারিয়রস, ওসারিও গ্রুপ, এল ক্যারাকল ইত্যাদি অসংখ্য স্থাপত্য ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে চিচেন ইতজায় ।
আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনের উপস্থিতি চিচেন ইতজাকে করে তুলেছে মেক্সিকোর জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে । ১৯৮৮ সনে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গৃহীত হয় । হাজার হাজার বছর পূর্বে সাহিত্যচর্চা , জ্যোতিবিদ্যা , পাথরে তৈরি সুউচ্চ স্থাপনা একের পর এক কিভাবে তারা বানিয়ে চলেছিল তা রহস্যই বটে !
tor-e-tokka.com# h/@.
ছবিঃ সংগ্রহ

