পাথরে তৈরী পৃথিবীর প্রাচীনতম আরব নগরী পেত্রা ( Petra )
পাথরে তৈরী পৃথিবীর প্রাচীনতম আরব নগরী পেত্রা
পাহাড় কেটে কোথাও বারো ফিট উঁচু , কোথাও আরও উঁচু রুম তৈরি করা হয়েছিল যা আজও রহস্যময় । নগরীর চারপাশের উঁচু পাহাড়গুলোতে প্রচুর ঝর্না ছিল যা পরবর্তীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়।পেত্রা নগরীর মূলগুহার পাশেই রয়েছে ‘খাজনেত ফেরাউন ‘ নামের মন্দিরটি । একসময় মন্দিরটি ফারাও রাজাদের ধনভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল । মন্দির , দালান ছাড়াও নগরীতে বিনোদনের জন্য ছিল নাট্যশালা । যেখানে প্রায় তিন হাজার দর্শক একসাথে বসতে পারত । ছিল দেড়হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়াম । দশ হাজার বর্গফুটের বিচারালয়, লাইব্রেরী , সৈন্যদের ব্যারাক সহ আধুনিক নগর ব্যবস্থার সবকিছুই ।
পেত্রা প্রাচীন আরব শহর । প্রায় দুহাজার বছরের পুরনো নগর । আরবের নাবাতিয়ান জাতির রাজধানী ছিল পেত্রা । মূলত বাণিজ্য পথকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল পেত্রা । আনেক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রাস্তা গিয়াছিল এর মধ্যদিয়ে । পথের যাত্রীদের নির্ভার করে রমরমা হয়ে উঠেছিল এনগর । বর্তমান জর্ডানের দক্ষিণ- পশ্চিমের গ্রাম ওয়াদি মুসার পূর্বে হুর পাহাড়ের পাদদেশে এর অবস্থান ।
পৃথিবীর প্রাচীনতম নগরীগুলোর মধ্যে অন্যতম পেত্রা । গ্রীক শব্দ ‘ petros ‘ যার অর্থ ‘পাথর’ । ধারণা করা হয় পাথর থেকে তৈরী বলেই এ নগরী পেত্রা নামেই পরিচিতি লাভ করেছিল । আরবী ভাষায় এনগরীকে বলা হত ‘আল বুত্তা’ । মিসরীয়রা একে ‘Pel sela’ বা ‘Seir’ নামেও ডাকত । Sela অর্থ শিলা । অসাধারণ শিলার জন্য পেত্রার আরেক নাম ‘ Rose- red city ‘ ।

পেত্রা অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ ছিল । চারপাশে উঁচু পাহাড়ি দেয়াল, উঁচু উঁচু স্তম্ভগুলো কোনটা গোলাকার আবার কোনটা বর্গাকার । পাহাড়ের গায়ে খোঁদাই করা পাথুরে কারুকার্য । পাহাড় কেটে কোথাও বারো ফিট উঁচু , কোথাও আরও উঁচু রুম তৈরি করা হয়েছিল যা আজও রহস্যময় । নগরীর চারপাশের উঁচু পাহাড়গুলোতে প্রচুর ঝর্না ছিল যা পরবর্তীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয়ে যায়।

পেত্রা নগরীর মূলগুহার পাশেই রয়েছে ‘খাজনেত ফেরাউন ‘ নামের মন্দিরটি । একসময় মন্দিরটি ফারাও রাজাদের ধনভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল । মন্দির , দালান ছাড়াও নগরীতে বিনোদনের জন্য ছিল নাট্যশালা । যেখানে প্রায় তিন হাজার দর্শক একসাথে বসতে পারত । ছিল দেড়হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়াম । দশ হাজার বর্গফুটের বিচারালয়, লাইব্রেরী , সৈন্যদের ব্যারাক সহ আধুনিক নগর ব্যবস্থার সবকিছুই ।
নগরীটি নির্মিত হয়েছিল বেশ সুবিধাজনক জায়গায় । উত্তরের বসরা ও দামেস্ক , পশ্চিমের গাঁজা , লোহিত সাগরের পাশের আকুয়াবা , লিউস সহ মরুভূমির উপর দিয়ে পারস্য উপসাগরে যাওয়ার প্রধান বনিজ্যিক পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো পেত্রারা । একারণেই পেত্রা অর্থনৈতিক ভাবে বেশ সমৃদ্ধ ছিল । নিরাপত্তার দিক দিয়েও ছিল অনেক সুরক্ষিত ।

খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ থেকে ২০০ পর্যন্ত পেত্রা ছিল নাবাতিয়ান রাজ্যের রাজধানী । নাবাতিয়ান রাজা চতুর্থ এরাটাস পেত্রাকে রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন । তখন এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ নগরী ছিল । পরবর্তীতে রোমান শাসনামলে রোমানরা সমুদ্র কেন্দ্রিক বাণিজ্য শুরু করলে পেত্রাদের আধিপত্য কমে যায় ।অর্থনৈতিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে ।
১০৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট ট্রোজান পেত্রা দখল করে নেয় । দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে শহরটির কিছুটা উন্নতি সাধিত হলেও পরবর্তীতে প্রতিদ্বন্দ্বী শহর ‘পামিরা’ পেত্রাদের অধিকাংশ বাণিজ্য দখল করে নেয় । ৩০৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভূমিকম্পে নগরীর অধিকাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় । সপ্তম শতকে মুসলমানরা পেত্রা দখল করে কিন্তু দ্বাদশ শতকে ক্রুসেডররা মুসলমানদের কাছ থেকে পেত্রা দখল করে নেয় । সময়ের বিবর্তনে যুদ্ধ- বিগ্রহ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পেত্রা নগরী একসময় প্রায়ই ধ্বংস হয়ে যায় ।

পেত্রা নগরীর কারুকাজে আরব ও রোমানীয় শিল্পের ছাপ লক্ষ্যনীয় । তথ্য মতে নাবাতিয়ানরা মূর্তি পূজা করত । তাই দেব দেবীর অনেক মূর্তিই নগরীর দেয়ালে খদাই করা অবস্থায় আছে । মধ্যযুগে এসে পেত্রার ধ্বংসাবশেষ পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হতে থাকে । ত্রয়োদশ শতকে মিসরের সুলতান বাইবারস পেত্রার ধ্বংসাবশেষ দেখতে যান ।

বহুবছর নগরীটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর ১৮২২ সনে সুইস পরিব্রাজক জোহান লুডিগ বুখাদত একে সারা বিশ্বের কাছে নতুন ভাবে পরিচয় করিয়ে দেন । ১৯৮৫ সনে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে পেত্রাকে । এ ঘোষণায় বলা হয়েছে ‘ one of the most precious cultural properties of man’s cultural heritage.’ পেত্রা সংস্কৃতি , সম্পদ আর ক্ষমতায় একসময় যে কত সমৃদ্ধ ছিল তা প্রমাণ করতে পেত্রার ধ্বংসাবশেষই যথেষ্ট । প্রতিবছর প্রায় এক মিলিয়নের মত পর্যটক এই ঐতিহ্যবাহী নগরীতে ঘুরতে যান ।
tor-e-tokka.com# h/@.
ছবিঃ সংগ্রহ

